কুলিয়ারচরে সংবাদ সম্মেলনের পর শিক্ষক ফারুককে আটক করেছে পুলিশ

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিঃ

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে মো. ফারুক মিয়া (৪৫) নামে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে হামলা, মারধর, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও জাল দলিল করে সম্পত্তি জবরদখল করার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে বৃদ্ধা মা ও নারী সাংবাদিক সহ ছোট সাত ভাই-বোন মিলে সংবাদ সম্মেলন করার পর অবশেষে অভিযুক্ত শিক্ষক ফারুক মিয়াকে আটক করেছে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ।

থানা পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা জানান, গত শুক্রবার (১৯মার্চ) সকালে বৃদ্ধা মা ও ভাই-বোনদের উপর হামলাসহ মারধোর করার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আত্মরক্ষার অযুহাতে পরদিন ২০মার্চ শনিবার ভোরে ৯৯৯ এ একাধিকবার ফোন করে মা ও ছোট ভাই-বোনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জানমালের নিরাপত্তা চান ওই শিক্ষক ফারুক মিয়া। ৯৯৯ থেকে ফোন করে কুলিয়ারচর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন ওই শিক্ষক ফারুক মিয়াকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে আনার জন্য। ৯৯৯ থেকে ফোন পেয়ে ওইদিন শনিবার সকালে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ ফারুক মিয়াকে ডেকে থানায় এনে বসিয়ে রাখেন।

অপরদিকে ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে মা ও ভাই-বোনেরা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করে শনিবার দুপুরে কুলিয়ারচর পৌর এলাকার বড়খারচর মহল্লায় নিজ বাড়িতে শিক্ষক ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে তার জন্মদাত্রী বৃদ্ধা মা মোছা. আনোয়ারা বেগম (৬৫) সহ তার ছোট ভাই রাকিবুর রহমান রফিক (২৭), সাকিবুর রহমান শফিক (২৫), দোসর রহমান (২১), কিশোর রহমান (২১), ছোট বোন সাংবাদিক ফারজানা আক্তার (৩৩), আফরোজা আক্তার আইরিন (৩০) ও পাপিয়া সুলতানা পলাশী (২৫) যৌথ ভাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে তারা স্থানীয় আলিফ বিজ্ঞান এন্ড কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল উপজেলার বড়খারচর মহল্লার মরহুম আব্দুর রাশিদের পুত্র মো. ফারুক মিয়া কর্তৃক বিভিন্ন কৌশলে তৈয়ারীকৃর বিভিন্ন জাল দলিল, জাল এনআইডি, বিভিন্ন কর্মকর্তাদের জাল স্বাক্ষরিত সনদের বিভিন্ন কাগজপত্র তুলে ধরে জন্মদাত্রী মা ও ভাই-বোনেরা বলেন, ফারুক মিয়া দীর্ঘ দিন যাবৎ ধরে তাদের জায়গা জমির দাগ খতিয়ান ও চৌহদ্দি ব্যবহার করে জাল দলিল তৈরি করে তাদের জায়গা-জমি জবরদখল করে আসছে। এতে প্রতিবাদ করায় পরিবারের সকল সদস্যদের স্তব্ধ করে রাখার জন্য তাদের নামে ১৯টি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছে এবং ফারুক মিয়ার স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে তাদের উপর হামলা, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে।

তারা আরো বলেন, গত ১৯ মার্চ শুক্রবার রাকিবুর রহমান রফিক, সাকিবুর রহমান শফিক ও পাপিয়া সুলতানা পলাশী নামে তিন ভাই-বোন বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন। অথচ ওই দিনের ঘটনা দেখিয়ে তাদেরকে জড়িয়ে থানায় একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে শিক্ষক মো. ফারুক মিয়া। সে এর আগেও দুইবার তাদের মাকে মারধোর করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলো বলে জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক ফারজানা আক্তার বলেন, পূর্ব আক্রোশের জের ধরে গত ১৯ মার্চ শুক্রবার সকালে পূনরায় তাদের উপর হামলা চালায় বড় ভাই ফারুক মিয়া। এসময় ফারজানা আক্তারের এক হাত ভেঙে দেয়। তার মাকে ও মারধর করে। ফারজানা আক্তার চিকিৎসাধীন অবস্থায় কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ছুটি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, তাদের বড় ভাই ফারুক মিয়া স্কুল ও কলেজের শতশত শিক্ষার্থীদের নামে বিভিন্ন ভূয়া সনদ তৈরি করে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করাসহ তাদের পরিবারের সদস্যের ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন ভূয়া রেজিস্ট্রেশন করে বিভিন্ন সনদ, সার্টিফিকেট, এনআইডি তৈয়ারি করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হয়েছে এবং উপরস্থ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে বহু অপকর্ম আসছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ভুক্তভোগীরা স্থানীয় প্রশাসনসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট এসব অপকর্মের সুষ্ঠ তদন্ত ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের আবেদন জানান এবং তাদের উপর হামলা, মিথ্যা মামলা, জাল দলিল করে জায়গা-জমি জবরদখল সহ বিভিন্ন কর্মকান্ডের তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানান। এছাড়া সাংবাদিক ফারজানা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, সংবাদ সম্মেলন করায় শনিবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে ফারুক মিয়ার লোকজন তাদের বাড়ীতে হামলা করে তাকে খুন করার চেষ্টা করে। এই মর্মে তার ফেইসবুক থেকে একটি স্ট্যাটাস দেয় “আমার বাড়ীতে হামলা দিয়েছে, আমাকে বাঁচান”। এর পর কুলিয়ারচর থানা পুলিশ ফারজানা আক্তারের বাড়ীতে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

সংবাদ সম্মেলনের সংবাদ, বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে ও অনলাইন টিভি চ্যানেলে প্রকাশিত হওয়ার পর মা ও ভাই-বোনদের মারধরের অভিযোগে শিক্ষক মো. ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে ওইদিন শনিবার দিবাগত রাত ১২.০৫ মিনিটের সময় মা মোছাঃ আনোয়ারা বেগমকে বাদি করে কুলিয়ারচর থানায় একটি মামলা রুজু করে পুলিশ। মামলা নং- ১৫, তারিখ – ২১-০৩-২০২১ ইং । মামলা রুজু করার পর রাত ১.৩০ মিনিটের সময় অভিযুক্ত ফারুক মিয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে রোববার সকাল ১০.৫৫ মিনিটের সময় কিশোরগঞ্জ আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।

এব্যাপারে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) একেএম সুলতান মাহমুদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলা রুজু হওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আসামী ফারুক মিয়াকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

Leave a Reply