
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধিঃ ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্যচাষ প্রযুক্তিসেবা সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় (২য় পর্যায়ে) প্রদর্শণী খামার বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দের বেশির ভাগ টাকাই লোপাটের অভিযোগ উঠেছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ সরোয়ার জামানের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে জানা গেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট ও সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সারওয়ার জামানের যোগসাজসে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটে নিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত হওয়া (২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে) প্রদর্শণী প্যাকেজের কার্প-নার্সারী, কার্প-মিশ্র, মনোসেক্স তেলাপিয়া ও চলমান পাবদা চাষ সহ ৪টি প্রকল্পেই ব্যপক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রমানও পাওয়া গেছে।
প্রদর্শণী প্যাকেজ এক (কার্প-নার্সারী, সরকারি বরাদ্দ ছিলো ৩০ হাজার টাকা) প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার লামচরী গ্রামের মোঃ হাছান ফারুক নামের এক কথিত খামারীকে যার মৎস্য খামারের ঠিকানা (অবস্থান) দেওয়া হয়েছে টুমচর ইউনিয়নের কালিরচর গ্রামে। সরেজমিনে গিয়ে ঐগ্রামে এমন কোন খামারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু তাহের জানান এক যুগ আগে লামচরি এলাকার হাছান ফারুক নামে এক লোক (কালিরচরে) আমাদের এলাকায় সরকারী খাসজমি দখল করে মাছ চাষ করতো। প্রায় ১০ বছর আগে আওয়ামিলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে এই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে কলিরচরে এমন কোন খামারের অস্তিত্বও নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন বিভিন্ন সময় শুনি সরকার মৎস্য চাষীদের জন্য বরাদ্দ দেয় তা কয়জন প্রকৃত চাষী পায়? কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের পেটে চলে যায়! হাছান ফারুকের বক্তব্য জানতে ছেয়ে মুঠো ফোনে বারবার ছেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
প্রদর্শণী প্যাকেজ দুই (কার্প-মিশ্র, সরকারি বরাদ্দ ছিলো ৩৫ হাজার টাকা) প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার বাঞ্চানগর গ্রামের মোহাম্মদ ওসমান হারুন নামের একজন খামারীকে। ওসমান হারুনের কাছে তার প্রদর্শণী খামারের অবস্থান জানতে চাইলে প্রথমে রায়পুর উপজেলার মোল্লার হাটে বললেও পরবর্তীতে আরো একটি খামার সদর উপজেলার চররমনী মোহন সাইফিয়া দরবার শরীফের পেছনে আছে বলে জানান। এই প্রকল্পে কিকি সহায়তা পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি ঢাকায় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আছেন বলে সংযোগ কেটে দেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় বিগত ১০ বছর থেকে ঐখামারে আবুল বাসার নামে এক ব্যক্তি মাছ চাষ করেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওসমান হারুনের থেকে লিজ নিয়ে এক দশক ধরে এই খামারে আমি মাছ চাষ করি। মাছ চাষে ওসমান হারুনের কোন মালিকানা বা অংশিদারিত্ব নেই। এটা কোন প্রদর্শণী খামার নয় , এখানে সাইনবোর্ড নেই এবং সরকারী কোন সহায়তাও পাই না।
প্রদর্শণী প্যাকেজ তিন (মনোসেক্স তেলাপিয়া, সরকারি বরাদ্দ ছিলো ৫০ হাজার টাকা) এপ্রকল্প দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার দালার বাজার ইউনিয়নের পশ্চিম লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত মোস্তফা মিয়ার স্ত্রী সামছের নাহারকে। সরেজমিনে গিয়ে ঐ ব্যক্তির কোন মৎস খামারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে সামছের নাহার জানান, আমার স্বামী মাছ চাষ করতো কিন্তু তিন বছর পূর্বে তিনি মারা যান, পাঁচ বছর থেকেই আমাদের কোন মৎস্য খামার নেই। উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তার অফিস থেকে মৎস চাষেরর জন্য কোন বরাদ্দ পেয়েছেন কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন কোন প্রকল্পের বিষয়ে জানা নেই, তবে করোনার প্রথম দিকে মৎস অফিস থেকে আমাকে যাওয়ার জন্য ফোন করে, সেখান থেকে একটি সাইনবোর্ড, এক প্যাকেট বিরাণী ও তিনশত টাকা দেয় এর কিছু দিন পর আবার ফোন দিলে আমার নাতিকে পাঠাই তার কাছে আনুমানিক চার’শ তেলাপিয়ার পোনামাছ দেয়, আমাদের ব্যক্তিগত কোন পুকুর না থাকায় পাশের পুকুরে ছেড়ে দেই। এসময় তিনি বেডরুমের খাটের নিছ থেকে একটি সাইন বোর্ড বের করে দেখান। সাইন বোর্ডে উল্লেখিত ৫০হাজার টাকা ববাদ্দের কত পেয়েছেন জানতে চাইলে ,কোন নগদ অর্থ বা উপকরণ পাননি বলে জানান তিনি।
প্রদর্শণী প্যাকেজ চার (পাবদা চাষ, সরকারি বরাদ্দ ছিলো ২৫ হাজার টাকা) প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়নের পুকুরদিয়া গ্রামের দীন মোহাম্মদকে। সরেজমিনে গিয়ে ঐ ব্যক্তির যে মৎস খামারের সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে খোঁজ নিয়ে জানা যায় তার মালিকানা চরশাহী গ্রামের আব্দুর মান্নান মাষ্টার নামের এক ব্যক্তির। মান্নান মাষ্টারের ছেলে সেলিম জানান খরিদ সুত্রে এই জমির মালিক আমার বাবা আমাদের নামে দললি, রেকর্ড , নামজারি ও হালসনের খাজনা দাখিলা পরিশোধ করা আছে । স্থানীয় যুবলীগনেতা দ্বীন মোহাম্মদ জোর পূর্বক আমাদের জমিতে মৎস অফিসের সাইন বোর্ড দিয়েছে। এই জমি আমরা কারো কাছে ইজারাও দেই নাই। তবে জমির মালিকানা নিয়ে কোন সদুত্তর না দিলেও মৎস অফিস থেকে পাবদা মাছের পোনা ও কিছু খাদ্য পেয়েছেন বলে জানান দিন মোহাম্মদ।
জানতে চাইলে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সারওয়ার জামান অফিসিয়ালি কোন বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। লক্ষ্মীপুরকে নিয়ে নানান বিষদগার করে বলেন,লক্ষ্মীপুরের মানুষ এরকম! লক্ষ্মীপুরের প্রতি আমার ধারণাই বদলে গেছে , আপনাদের যা মন চায় লিখুন, আমার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করুন, তা আমি দেখবো। এবিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই।
এবিষয়ে জানতে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার অফিসে বার বার গিয়েও তাঁকে না পাওয়ায় কোন মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।