লক্ষ্মীপুরের মেয়র মাসুম, রামগঞ্জে ৬ ইউপিতে বিদ্রোহী জয়ী, সহিংসতায় নিহত ১

মিজানুর শামীমঃ সকল জল্পনা কল্পনা শেষে ২৮ নভেম্বর রোববার লক্ষ্মীপুর পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিপুল ভোটে নৌকার প্রার্থী মোজাম্মেল হায়দার মাসুম ভূঁইয়া লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।
অপরদিকে তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে জেলার রামগঞ্জ ও রায়পুর উপজেলার ২০ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের কাছে ৭ টিতে নৌকার পরাজয় হয়েছে। এ দুই উপজেলা ৭ ইউনিয়নে স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) ও ১৩ টিতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

জেলার রামগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতায় সাজ্জাদুর রহমান সজিব নামে এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হয়েছে। রোববার বিকেল ৫টার দিকে চাঁদপুর হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়েছে। এর আগে বিকেলে উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়নের নয়নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আমির খানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় সজিবেরে মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত সজিব রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ও একই ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তারের ছেলে।

এছাড়া রামগঞ্জে নৌকা মার্কায় সিল মারার অভিযোগে ৩৭টি ব্যালট পেপার বাতিল করা হয়েছে। রবিবার বেলা সাড়ে ১১ নম্বর চন্ডিপুর ইউনিয়নের ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। প্রিসাইডিং অফিসার বোরহান উদ্দিন বলেন, জোর করে নৌকা মার্কায় সিল দেওয়া ৩৭টি ব্যালট পেপার বাতিল করা হয়েছে। হঠাৎ করে কেন্দ্রের ৯ নম্বর নারী বুতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যালটে সিল মেরে কিছু লোকজন পালিয়ে যায়। তাই এই ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ভোটের আগেই রামগঞ্জের ভাদুর এলাকা থেকে ৩১ জনকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ আটক করা হয়। এসময় একটি এলজি, ৪টি চাপাতি, ৯টি ককটেলসহ দেশীয় আরও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলার ভোলাকোট ইউনিয়নের লক্ষীধরপাড়া ভোট কেন্দ্রর পাশে থেকে রবিবার সকাল ১১টার দিকে চাইনিজ কুড়াল ও দেশীয় অস্ত্রসহ ৯ জন যুবককে আটক করে টহলরত বিজিবির সদস্যরা। এ নিয়ে রামগঞ্জে অস্ত্রসহ মোট আট হলেন ৪০ জন।

রায়পুর উপজেলার বামনী, কেরোয়া, চরপাতা ও সোনাপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ ভোট কেন্দ্রে চেয়ারম্যান পদে নৌকা মার্কার এজেন্ট ছাড়া অন্যান্য প্রার্থীদের এজেন্ট চোখে পড়েনি। এসব ইউনিয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা ও প্রতিপক্ষকে হুমকি ধমকি দেয়াসহ নানান ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় এজেন্ট বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে হাতপাখা মার্কার প্রার্থী পুনরায় নির্বাচন দাবি করে দুপুরে ভোট বর্জন করেছেন।
জানা গেছে, রাত ৯টার দিকে বেসরকারিভাবে ফলাফল মেয়র ঘোষণা করেছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। এতে বিপুল ভোটে নৌকার প্রার্থী মোজাম্মেল হায়দার মাসুম ভূঁইয়া লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ৩৭’৭০৪ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জহির উদ্দিন ২’৫১৮ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকিরুল আল মামুন ৪৭০ ভোট ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের আবদুর রহিম ২৮৫ ভোট পেয়েছেন। লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডে ৭১ হাজার ৩২২ জন ভোটারের মধ্যে ৪১ হাজার ৩০ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৫৩টি ভোট বাতিল হয়েছে। পৌরসভায় ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এ ভোটাররা তাদে ভোট প্রদান করেছেন।

পৌরসভার পনেরোটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিতরা হলেন, ১- গোলাম মোস্তফা, ২- মোঃ আল-আমীন, ৩- মো: সুমন, ৪- মো: আবুল কালাম, ৫- উত্তম দত্ত, ৬- আবুল খায়ের স্বপন, ৭- কামাল উদ্দিন খোকন, ৮- জাহিদুজ্জামান চৌ: রাসেল, ৯- মোহাম্মদ আলী, জসিম উদ্দিন মাহমুদ, ১১- মাকছুদুর রহমান আলমগীর, ১২- রিয়াজ পাটোয়ারী রাজু, ১৩- আহসানুল করিম শিপন, ১৪- জহিরুল ইসলাম, ১৫- রাকিবুল হাসান রাজীব।
নির্বাচিত নারী কাউন্সিলররা হলেন, ১/২./৩ নং ওয়ার্ডে শাহীন আক্তার ফেরদৌসী, ৪/৫/৬ নং ওয়ার্ডে তাসলিমা আক্তার, ৭/৮/৯ নং ওয়ার্ডে বেগম লুলু, ১০/১১/১২ নং ওয়ার্ডে সাহিদা আক্তার রীনা, ১৩/১৪/১৫ নং ওয়ার্ডে রাহিমা ভূঁইয়া

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনী এলাকার আট ভাগের এক ভাগের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। নিয়ম অনুযায়ী বাকি তিনপ্রার্থীর জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হবে।

এদিকে ২৮ নভেম্বর রবিবার রাতে ১০টার দিকে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবু তাহের ও রায়পুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হারুন মোল্লা তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। এতে রামগঞ্জ ও রায়পুর উপজেলার ২০ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ৭ টিতে নৌকা মার্কার পরাজয় হয়েছে। এ দুই উপজেলা ৭ ইউপিতে স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী) ও ১৩ ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

রামগঞ্জে নৌকা প্রতীকে কাঞ্চনপুর ইউপিতে নাসির উদ্দিন, নোয়াগাঁওতে মোহাম্মদ সোহেল পাটওয়ারী, ভাদুর ইউপিতে জাবেদ হোসেন ও দরবেশপুরে বর্তমান চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া ৬ ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র চেয়ারম্যানরা হলেন- ইছাপুরে উপজেলা আওয়ামী নেতা আমির হোসেন খান (আনারস), চন্ডিপুরে শামছুল ইসলাম সুমন (মোটরসাইকেল), লামচরে ফয়েজ উল্যাহ জিসান পাটওয়ারী (আনারস), করপাড়া জাহিদ মির্জা (ঘোড়া) ভোলাকোটে দেলোয়ার হোসেন দিলু (চশমা) ও ভাটরাতে শামছুল আলম বুলবুল (আনারস)।

এদিকে একটি সতন্ত্র ছাড়া রায়পুরে বাকি ৯ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এরমধ্যে তিনিটিতে বিনাভোটে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীকে আগেই বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানরা হলেন- উত্তর চর আবাবিল ইউপিতে সতন্ত্র প্রার্থী দুলাল হাওলাদার। নৌকার প্রতীকে উত্তর চরবংশীতে বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল হোসেন হাওলাদার (বিনা ভোট), চরমোহনাতে বর্তমান চেয়ারম্যান শফিক পাঠান (বিনা ভোটে), সোনাপুরে বর্তমান চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ জালাল কিসমত, চরপাতায় সুলতান মামুনুর রশিদ, কেরোয়ায় বর্তমান চেয়ারম্যান শাহিনুর বেগম রেখা, বামনীতে অনেক নাটকের পরে বর্তমান চেয়ারম্যান তাফাজ্জল হোসেনকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে, দক্ষিণ চরবংশীতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরে বর্তমান চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরায়েজি, দক্ষিণ চরআবাবিলে হাওলাদার নূরে আলম জিকু ও রায়পুরে শফিউল আজম সুমন চৌধুরী (বিনা ভোটে) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

 

 

 

Leave a Reply