
মিজানুর শামীমঃ লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার চাঞ্চল্যকর শিশু নুশরাত জাহান নুশু (৭) ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় শাহ আলম রুবেল নামের একজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ১২ অক্টোবর মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লক্ষ্মীপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুদ্দৌলা কুতুবী এ রায় দেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির গ্রামের বাড়ী রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের সিরাজুল ইসলামের পুত্র।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌশুলী এডভোকেট মো. আবুল বাশার জানান, আদালত একইসঙ্গে দন্ডপ্রাপ্ত আসামীর ১ লাখ টাকা জরিমানা ও আরও চার বছর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। এছাড়া একই মামলায় অপর এক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় আদালত তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন।
এসময় তিনি আরও জানান, রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের সৌদি প্রবাসী মো. এরশাদ মিয়ার একমাত্র কন্যা স্থানীয় ফয়েজে নূর মাদ্রাসার ২য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী নুশরাত জাহান নুশুকে ২০১৮ সনের ২৩ মার্চ দুপুরে নিজেদের বাড়ি থেকে অপহরন করে প্রতিবেশী শাহ আলম রুবেল। পরে তাকে ধর্ষণ শেষে গলাটিপে হত্যা করে বস্তাবন্দি করে ব্রিজের নিচে ফেলে দেয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, শিশু নুশরাত জাহান নুশু (৭) ২০১৮ সালের ২৩ মার্চ দুপুরে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের ঘটনায় নুশরাতের মা রেহানা বেগম বাদী হয়ে রামগঞ্জ থানায় একটি ডায়েরি করেন। তিনদিন পর ২৬ মার্চ কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপাড়া ঠাকুরবাড়ির সামনের ব্রিজের নিচ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের পর জানা গেছে নুসরাতকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে পুলিশ আদালতে শাহ আলম রুবেল ও বোরহান উদ্দিন সহ দুই প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। আদালত দীর্ঘ শুনানি ও ১৩ জন সাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণের পর এ রায় দেন। সাক্ষ্য প্রমাণে রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় আদালত তাকে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসির রশি লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখার আদেশ দেন। অপরদিকে বোরহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেন।
এদিকে রায়ের পর আদালতপাড়ায় অপেক্ষমান শিশু নুসরাতের মা ও মামলার বাদী রেহানা বেগম ও চাচা আকবর হোসেন রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সনের ২৩শে মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের সামান্য আগে উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম নোয়াগাঁও কালা মেস্ত্রি বাড়ীর কুয়েত প্রবাসী এরশাদ মিয়ার কন্যা স্থানীয় ফয়েজে রাসূল নুরানী মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী নুসরাত নুশু (৮) নিখোঁজের তিনদিন পর ২৬শে মার্চ সোমবার সকাল ১১টায় নুসরাতদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে পার্শ্ববর্তী কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপাড়া গ্রামের ঠাকুর বাড়ীর ওয়াপদা খালে ভাসমান ব্যাগ দেখতে পায় স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় রামগঞ্জ থানা পুলিশের এস আই পঙ্কজ ও এস আই কাউসারুজ্জামান। ওইসময় স্থানীয় এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে পুলিশ ব্যাগ খুলে দেখে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় একটি মেয়ে শিশুর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। খবর পেয়ে ছুটে আসেন মা রেহানা বেগম ও মামা জিয়া উদ্দিন। কানের দুল ও জামা দেখে নুশরাতের লাশ শনাক্ত করেন তারা। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর হসপিটালে মর্গে প্রেরণ করলে ধর্ষন ও শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত মিলে। আটক করা হয়, ধষণ ও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা শাহ আলম রুবেলের বন্ধু নোয়াগাঁও বাজার ক্যাবল অপারেটর ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিনকে। বোরহান উদ্দিনের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ১লা এপ্রিল মোবাইল ট্র্যাকিং করে রামগঞ্জ থানা পুলিশ খুলনা মেট্রো পলিটন পুলিশ ধর্ষক ও খুনি শাহ আলম রুবেল (৩২) কে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পরে ঘাতক শাহ আলম রুবেল লক্ষীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে জানান, ঘটনার দিন শুক্রবার সকালে আইসক্রিম খাওয়ার লোভ দেখিয়ে শিশু নুসরাতকে তার ঘরে ডেকে নেয়ার পর গলা চেপে ধরে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করা অবস্থায় শ্বাসরোধ হয়ে সে মারা যায়। লাশ লুকানোর জন্য পাটি দিয়ে মুড়িয়ে স্টিলের আলমিরার উপর রেখে দেয়। রাতে হাত পা মুড়িয়ে নুসরাতের লাশ ব্যাগে ভরে ওইদিন রাতেই ক্যাবল অপারেটর ব্যবসায়ী বন্ধু বোরহানের সহযোগিতায় ডেকে আনা হয় সিএনজি চালক রাকিবকে। লাশ ভর্তি ব্যাগটি সিএনজিতে তুলে বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ব্রহ্মপাড়া ঠাকুর বাড়ির খালে ফেলে দেয়া হয়।